নানাবিধ সংকটে সেবা দিচ্ছে রাবি মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্র
প্রকাশিত:
মার্চ ৩, ২০২৪; সময়: ৩:৪৫ pm | 
খবর > বিশেষ সংবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাবি : শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র। নানাবিধ সংকটের মধ্যেও দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর পেরিয়েছে সেবা দানকারী এই প্রতিষ্ঠানটি। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রায় ‘৩০টির অধিক’ সমস্যায় সেবা ও পরামর্শ পেয়ে থাকেন ক্লায়েন্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সংকট কাটে নি এই মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে। যেখানে নেই প্রফেশনাল কাউন্সিলর। পাশাপাশি জনবল সংকট, পর্যাপ্ত আর্থিক বাজেট বরাদ্দ না থাকা, অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনাসহ নানা সংকট রয়েছে। এক কক্ষ বিশিষ্ট বড় এই কেন্দ্রটিতে নেই পৃথক পৃথক ছোট কাউন্সিলিং কোনো কক্ষ। ফলে সেবা নিতে আসা ক্লায়েন্টদের গোপনীয়তা নষ্টের ভয় থাকে।
সংশ্লিষ্ঠরা জানান, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিতে আসা এই কেন্দ্রটিতে ক্লায়েন্টদের স্বতন্ত্র ও গ্রুপ সেশন দেওয়া হয়। একজন রোগীর সমস্যার ধরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সর্বচ্চ ১৪ টি সেশন দেওয়া হয়। অন্যদিকে গ্রুপ সেশনের ক্ষেত্রে প্রতিটি গ্রুপে ১৫ থেকে ২০ জন থাকেন। এক্ষেত্রে কমন কিছু সমস্যা যা একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের সবারই থেকে থাকে।
মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৭ সালের যাত্রাকালীন সময় থেকে শুরু করে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৩৬২ জন এই সেবা নিয়েছেন। যার মধ্যে ছাত্র ১ হাজার ৮৭ জন, ছাত্রী ১ হাজার ৯৩ জন, শিক্ষক ও শিক্ষিকা ১৩৬ জন, কর্মকর্তা ও কর্মচারী ১৩৬ জন। এই সময়ের মধ্যে ১ হাজার ৭২৩ জনকে মোট ৫ হাজার ৭৮৭ টি ব্যক্তিগত বা স্বতন্ত্র সেশন দেওয়া হয়। অন্যদিকে ১ হাজার ৫৫৭ জন ক্লায়েন্টকে ৪৩৪ টি গ্রুপ সেশন দেওয়া হয়।
গত বছর ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে মানসিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে আসেন ৬৮৬ জন ক্লায়েন্ট। ছাত্র ৩৩৪ জন, ছাত্রী ৩১৭ জন, শিক্ষক ও শিক্ষিকা ২২ জন এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারী ১৩ জন। এই সময়ের মধ্যে ৪১৭ জন ক্লায়েন্টকে ১ হাজার ৮৭৭টি ব্যক্তিগত বা স্বতন্ত্র সেশন এবং ৩২৩ জন ক্লায়েন্টকে ৭২ টি দলগত সেশন দেওয়া হয়।
মানসিক এই কেন্দ্রটিতে হতাশা, বিষণ্নতা, আসক্তিজনিত (সোশ্যাল মিডিয়া, মাদক) সমস্যা, ওসিডি, রিলেশন সমস্যা, ঘুমজনিত সমস্যা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সমস্যা, মানসিক চাপ, সেক্সুয়াল হ্যারেজমেন্ট, মুড সুইং, প্যানিক ডিসঅডার, আত্মহত্যার প্রবণতাসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসেন ক্লায়েন্টরা। সেবা নিতে আসা রোগীদের সমস্যার ধরন অনুযায়ী ব্যক্তিগত বা গ্রুপ সেশন দেওয়া হয়।
বিভিন্ন সংকটের মধ্যেও শিক্ষার্থীরা যথাযথ সেবা পাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে, পরিচালক ড. কাজী ইমরুল কায়েশ বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে শিক্ষার্থীরা সেবা পাচ্ছে কিন্তু যথাযথ পরিবেশ এখনও নিশ্চিত হয় নি। শিক্ষার্থীরা সেবা পেয়ে উপকৃত হচ্ছে এবং তারা যেই সেবা পাচ্ছে যা খারাপ আমি বলবো না কিন্তু যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত হলে আরো কার্যকরী হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ব্যাপারে খুবই ইতিবাচক। সকল সংকট, সমস্যা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। সেগুলো সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন৷
তবে মানসিক সমস্যা সম্পর্কিত সংকটগুলি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু বিষয় নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন এই পরিচালক। তিনি বলেন, পারিবারিক সামাজিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো আরো দৃঢ় করা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা জোরদার করা, মানসিক রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা প্রদান করা কেননা অনেকে মনে করেন মানসিক রোগ একবার হয়ে গেলে এটা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয় যা সম্পূর্ণভাবে ভুল ধারণা।
তিনি আরো বলেন, এর বাইরে আমাদের আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি যেমন কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস বাড়ানো। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, শরীরচর্চা এ বিষয়গুলো চর্চা থাকলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তি, মাদকাসক্তি সহ অন্যান্য সমস্যা অনেকাংশে কমে যায়। যত বেশি কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস এর সাথে যুক্ত থাকবে তত বেশি অন্যান্য আসক্তি বা মানসিক সমস্যা থেকে সহজেই উত্তরণ পাবে শিক্ষার্থীরা।
ক্যারিয়ার সম্পর্কে হতাশার কারণ উল্লেখ করে এই পরিচালক বলেন, অনেকসময় শিক্ষার্থীরা ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগে থাকে। যেমন পড়ালেখা শেষ করে কোন চাকরি করবে অথবা কোন ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা ফুটিয়ে তুলতে পারবে। মূলত অনেক শিক্ষার্থীদের কাছে ক্যারিয়ার সম্পর্কিত পর্যাপ্ত তথ্য থাকে না। ফলে তারা ‘এ্যানজাইটি ডিপ্রেশনে’ ভুগে। এজন্য ক্যারিয়ার প্লান বা এ বিষয়ে তাদের পর্যাপ্ত তথ্য প্রদান করতে হবে।
সেবা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন উল্লেখ করে এই পরিচালক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে অনেক শিক্ষার্থী এসেছেন যারা সেবা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। এমনকি সুস্থ হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি এসে তাদের সুস্থতা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারার বিষয় জানিয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থী এসেছেন যারা গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। সেবা নিয়ে পরবর্তীতে সুস্থ হয়ে এ্যাকাডেমিক ফলাফল ভালো হয়েছে এমনটিও অনেকে জানিয়েছেন।
সংকট নিরসনে প্রশাসন থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম বলেন, সত্য বলতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র গত কয়েক বছরে যে পরিসরে যাওয়ার কথা ছিল সেভাবে যায় নি। কিন্তু শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠার সময়ে বিদেশি সাহায্যসহ অন্যান্য বিষয়াদি চিন্তা করে যেভাবে শুরু করা হয়েছিলো পরবর্তীতে সেভাবে হয়ে ওঠে নি। অন্যদিকে মানসিক সমস্যা সম্পর্কিত সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টদের অবশ্যই প্রাইভেসির প্রয়োজন আছে। যেটা এখনও কেন্দ্রটিতে ছোট ছোট কাউন্সিলিং কক্ষ আকারে নিশ্চিত করা সম্ভব হয় নি। এর পাশাপাশি কেন্দ্রটির অন্যান্য সংকট সমাধানে প্রশাসন থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।




