রাজশাহীর মাদক সিন্ডিকেটে আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক : মাদক ব্যবসার মাধ্যমে গড়ে তোলা অবৈধ সম্পদ নিয়ে চরম উদ্বেগে পড়েছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর শীর্ষ হেরোইন কারবারিরা। আদালতের নির্দেশে ইতোমধ্যে দুই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। আরও অন্তত ২০ জনের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান চলছে। পর্যায়ক্রমে গোদাগাড়ীর তালিকাভুক্ত ১৮৪ জন হেরোইন কারবারিকেই তদন্তের আওতায় আনার প্রস্তুতি নিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
সম্প্রতি কারাগারে থাকা শীর্ষ মাদক কারবারি তারেক হোসেনের সম্পদ ক্রোকের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই গোদাগাড়ীর মাদক সিন্ডিকেটে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনেকেই এখন নিজেদের অবৈধ সম্পদ অন্যের নামে সরিয়ে নেওয়া কিংবা গোপন করার চেষ্টা করছেন। তবে অবৈধ সম্পদ জব্দের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
ডিএনসি সূত্র জানায়, গত বছরের শেষ দিক থেকে তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু হয়। যাদের বৈধ আয়ের উৎস নেই, অথচ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে আদালতে মামলা করা হচ্ছে। আদালতের আদেশে এসব সম্পদ ক্রোক করা হচ্ছে, যাতে সেগুলো বিক্রি, হস্তান্তর বা গোপন করা না যায়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ এপ্রিল রাজশাহীর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত গোদাগাড়ীর সহড়াগাছি গ্রামের মাদক কারবারি মো. আব্দুল্লাহ ও তার স্ত্রী সায়েরা বেগমের নামে থাকা জমি ক্রোকের আদেশ দেন। এতে আব্দুল্লাহর নামে ছয়টি দলিলে থাকা ১৯৯ দশমিক ২১ শতাংশ এবং সায়েরা বেগমের নামে পাঁচটি দলিলে থাকা ১৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ জমি জব্দ করা হয়।
এর আগে ২৩ মে একই আদালত গোদাগাড়ী পৌরসভার মাদারপুর এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারি তারেক হোসেনের চারটি দলিলে থাকা ১৯৯ দশমিক ১১৭৫ সহস্রাংশ জমি ক্রোকের নির্দেশ দেন।
ডিএনসি জানায়, আব্দুল্লাহ ও সায়েরা দম্পতি মাদক ব্যবসার মাধ্যমে এসব সম্পদ অর্জন করেন। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেন ডিএনসির রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক আলী আসলাম হোসেন। আদালতের আদেশের পর ক্রোককৃত সম্পত্তিতে সরকারি নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয়দের ভাষ্য, গোদাগাড়ীর অন্যতম শীর্ষ মাদক কারবারি তারেক হোসেন ভারত থেকে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ হেরোইন এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করতেন। গত বছরের ২২ এপ্রিল সেনাবাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত অভিযানে তার বাড়ি থেকে হেরোইন বিক্রির ১৩ লাখ টাকা উদ্ধারসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলার তিরিন্দা ভাজনপুর এলাকায় তার গরুর খামারে অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৬ কেজি হেরোইন উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকেই তিনি রাজশাহী কারাগারে আছেন।
পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেন ডিএনসির রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান। ওই মামলায় আদালত প্রায় ২৭ লাখ ৬১ হাজার টাকা মূল্যের জমি ক্রোকের নির্দেশ দেন।
গোদাগাড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুল ইসলাম বলেন, “আদালতের ক্রোকাদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় এসব সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই। আদালতের নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।”
গোদাগাড়ী নাগরিক স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালাহউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, “মাদক ব্যবসায়ীদের অবৈধ সম্পদ জব্দের উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। এখন তারা সম্পদ অন্যের নামে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সেটিও যাতে সম্ভব না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গোদাগাড়ী পৌরসভার সাগরপাড়া এলাকার আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি আবুল কালাম আজাদের অবৈধ সম্পদেরও অনুসন্ধান চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ হেরোইন দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে সাতটি মাদক মামলা থাকলেও ব্যবসা বন্ধ হয়নি। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হওয়ার পর থেকে তিনি পরিবারসহ আত্মগোপনে রয়েছেন।
ডিএনসির রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, “মাদক ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করতেই অবৈধ সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দুইজনের সম্পদ ক্রোক হয়েছে। আরও ২০ জনের বিষয়ে তদন্ত চলছে। সম্পদের তথ্য যাচাইয়ে ২০ থেকে ২২টি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হচ্ছে। যাদের বৈধ আয়ের উৎস নেই, অথচ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, ডিএনসির তালিকায় গোদাগাড়ীর ১৮৪ জন শীর্ষ মাদক কারবারির নাম রয়েছে। এরা মূলত হেরোইন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের অধীনেই অন্যরা কাজ করে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে তদন্তের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



