মাসে ৬ হাজার রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ, সীমান্তে অসহায় বিজিবি

প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৫; সময়: ১০:৪১ am | 
খবর > জাতীয়

পদ্মাটাইমস ডেস্ক: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা সরকারের সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) যুদ্ধ যত তীব্র হচ্ছে, ততই বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের হার বাড়ছে। সংঘর্ষের শিকার হয়ে সাধারণ রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। এতে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রতিদিন গড়ে ২২০, মাসে সাড়ে ৬ হাজার রোহিঙ্গার প্রবেশ

সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত নতুন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২২০ জন এবং প্রতিমাসে সাড়ে ৬ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এর বাইরেও আরও ৫ থেকে ১০ হাজার রোহিঙ্গা অনিবন্ধিত অবস্থায় সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের ‘মানবিক করিডর’ প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ

জাতিসংঘ নতুন করে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক করিডর চালু ও খাদ্য সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে, যা বাংলাদেশে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, “এই করিডর চালু হলে তা শুধু মানবিক ইস্যু নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, করিডর নিয়ে জাতিসংঘের পরিকল্পনা, কৌশল ও পূর্ণাঙ্গ খসড়া জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। এ বিষয়ে অন্ধকারে থাকার সুযোগ নেই, কারণ এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনিরুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, “করিডর চালু হলে তা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হতে পারে এবং চীন, ভারত, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সংঘাত ঘটাতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”

সীমান্তে বিজিবির দুর্বলতা ও বাস্তবতা

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর কক্সবাজার রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এমএম ইমরুল হাসান জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নজরদারিতে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। “কেওড়াবাগান, কাদামাটি ও কোমরসমান পানির মধ্যে দিয়ে বিজিবির সদস্যরা কাজ করেন। একদিকে দৌড়ালে অন্যদিক দিয়ে রোহিঙ্গা প্রবেশ করে। গুলি চালানো সম্ভব নয়, কারণ আমরা মানবাধিকারকে শ্রদ্ধা করি।”

তিনি জানান, সীমান্তে পর্যাপ্ত আলো, আধুনিক ক্যামেরা বা প্রযুক্তি নেই, কাঁটাতারের সুরক্ষাও সীমিত। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইতিমধ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং দুটি নতুন ব্যাটালিয়নের চাহিদাও জানানো হয়েছে।

তার ভাষায়, “বিজিবি একা এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পারবে না। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। রোহিঙ্গারা যদি বাংলাদেশে কোনো সহানুভূতি না পেত, তাহলে এত সাহস করে সীমান্ত পেরোত না।”

জনসংখ্যা ও জন্মহার বাড়ছে, চাপ বাড়ছে বাংলাদেশের ওপর

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৫১ হাজার ছাড়িয়েছে। আশ্রিতদের মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশু এবং প্রতিবছর গড়ে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হচ্ছে, যা দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারী ৫১ শতাংশ এবং পুরুষ ৪৯ শতাংশ। এসব মানুষের বসবাস কক্সবাজারের ২৭টি ক্যাম্পে, যেখানে অনেকেই আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছেন।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন