শেখ হাসিনার বিচার যেভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে

পদ্মাটাইমস ডেস্ক: একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেই এবার সিদ্ধান্ত হবে- জুলাই অভ্যুত্থান দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাস্তি হবে কি না।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ আগামী সোমবার এ রায় ঘোষণা করবে। এ মামলায় আসামি করা হয়েছে শেখ হাসিনাকে, তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে। তাদের মধ্যে মামুন দায় স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন। তিনি একমাত্র হাজতি আসামি; বাকি দুজনকে পলাতক উল্লেখ করে মামলার বিচার চলছে।
তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে- আন্দোলন দমনের নামে ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, নির্দেশ, প্ররোচনা, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম, অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের দুই বেঞ্চে মোট ৪৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে এবং একটি মামলার রায় ঘোষণার অপেক্ষায়। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের জন্যও তদন্ত শুরু করেছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। শেখ হাসিনার সরকারের বহু মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা এবং সেনাবাহিনীর প্রায় দুই ডজন সাবেক–বর্তমান কর্মকর্তা এসব মামলার আসামি।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে ২০১০ সালে বর্তমান কাঠামোয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করে আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর অর্ধশতাধিক মামলার রায় আসে; ১৮৯ জন দণ্ডিত হন, যাদের মধ্যে ১৪০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আপিল শেষে ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে- পাঁচজন জামায়াতে ইসলামীর নেতা, একজন বিএনপির। ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের আরও ৩০টি মামলা বিচারাধীন।
তবে জুলাই হত্যার বিচার শুরুর পর আপাতত এসব মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ স্থগিত রয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরো তিনটি মামলা রয়েছে- বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে দুটি এবং শাপলা চত্বরে গণহত্যার অভিযোগে একটি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা ভারত যান। দেশে বিভিন্ন আদালত ও থানায় তার বিরুদ্ধে কয়েকশ মামলা হয়। এরপরই জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনার ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন- আইসিটি আইনের অধীনে এই বিচার করা সম্ভব। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ধারা ৩(১) অনুযায়ী- যে কেউ, যে কোনো সময়, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধ করলে এ আইনে বিচার হতে পারে।
তবে শেখ হাসিনার আমলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত মনে করেন- আইনটি ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটভিত্তিক, তাই জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ এতে খাটে না। অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন- মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা অনুযায়ী এই বিচার সম্পূর্ণ বৈধ।
মামলার ধারাবাহিকতায় দেখা যায়- ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা পড়ে। ১৭ অক্টোবর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ১০ নভেম্বর ইন্টারপোল রেড নোটিশের উদ্যোগ নেওয়া হয়; ডিসেম্বর প্রয়োজনীয় নথি পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল বাংলাদেশ পুলিশ ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশের আবেদন পাঠায়। ১২ মে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা। ১ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন ও সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে মামলার বিচার শুরু হয়। একই দিন শেখ হাসিনা ও কামালের বিরুদ্ধে ফের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
১০ জুলাই তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু এবং সাবেক আইজিপি মামুনকে রাজসাক্ষী হওয়ার অনুমতি দেয় ট্রাইব্যুনাল। মামলায় সাক্ষী রাখা হয়েছিল ৮১ জনকে, শেষ পর্যন্ত সাক্ষ্য দেন ৫৪ জন- যাদের মধ্যে ছিলেন নিহতদের পরিবার, গণঅভ্যুত্থানের নেতা নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। ২৩ অক্টোবর যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রাখা হয়। ১৩ নভেম্বর আদালত জানায়- রায় ঘোষণা হবে ১৭ নভেম্বর।




