শেখ হাসিনার বিচারে যা বলেছেন সাক্ষীরা

পদ্মাটাইমস ডেস্ক: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে মোট ৫৪ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করেছে প্রসিকিউশন। তাদের মধ্যে আসামি থেকে রাজসাক্ষী হয়ে ওঠা সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের জবানবন্দিও রয়েছে।
এছাড়া প্রয়াত লেখক, গবেষক ও মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর মৃত্যুর আগে একটি লিখিত জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালে জমা দেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের দুজন উপদেষ্টা ও জাতীয় দৈনিকের এক সম্পাদকসহ ৮১ জনকে সাক্ষী হিসেবে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত ৫৪ জনের সাক্ষ্য শোনে আদালত। এসব সাক্ষ্যের পাশাপাশি আন্দোলন দমাতে এবং আন্দোলনে গুলি চালানোর বিষয়ে শেখ হাসিনার কিছু কথোপকথনও ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আদালতে উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন।
সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন রংপুরে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, আহত আন্দোলনকারী খোকন চন্দ্র বর্মণ ও আব্দুল্লাহ আল ইমরান, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক এবং জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।
গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আন্দোলন দমনে ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা, নির্দেশ দেওয়া, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর আওতায় পাঁচটি অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। এ মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও আসামি। সাবেক আইজিপি মামুন ইতোমধ্যে দায় স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন।
যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ খোকন চন্দ্র বর্মণ গত ৩ আগস্ট নিজের ক্ষতবিক্ষত মুখমণ্ডল দেখিয়ে আদালতে শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। ২৩ বছর বয়সী খোকনের বাঁ চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে, নাক ও মুখমণ্ডলও বিকৃত। দেশে চিকিৎসার পর তাকে রাশিয়ায়ও নিয়ে যাওয়া হয়। ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে সেনাবাহিনী এলাকা ছাড়ার পর পুলিশ ‘পাখির মতো’ গুলি চালায় বলে তিনি আদালতকে জানান। ফ্লাইওভারের নিচে আশ্রয় নেওয়া অবস্থায় একজন পুলিশ সদস্য তার মাথা নিশানা করে গুলি ছোড়েন বলে তার অভিযোগ।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় সাক্ষ্য দিতে এসে ছেলের মৃত্যুর ভিডিও দেখে নীরবে কেঁদে ওঠেন তার বাবা মকবুল হোসেন। তিনি বলেন, জীবদ্দশায় ছেলের হত্যার বিচার দেখতে চান।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মাহফুজুর রহমান জানান, আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধদের ভর্তি না করতে ডিবি সদস্যরা চাপ দেন। নতুন আক্রান্তদের ভর্তি না করতে এবং ভর্তি রোগীদের রিলিজ না দিতে ‘উপরের নির্দেশ’ থাকার কথাও তাকে জানানো হয়। বাধ্য হয়ে তারা অনেক ক্ষেত্রে গুলিবিদ্ধের তথ্য পরিবর্তন করে ভর্তি করেন, যাতে অসহায় শিক্ষার্থীরা চিকিৎসা পায়।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ আদালতে তুলে ধরে বলেন, ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলা হয়, যা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার বৈধতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তার ভাষায়, “এই বক্তব্য সারাদেশের শিক্ষার্থীদের অপমানিত করে তোলে এবং ১৮ জুলাই সর্বস্তরের ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে আসে।”
তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর তার সাক্ষ্যে বলেন, আন্দোলন দমনে সারা দেশে তিন লাখ পাঁচ হাজারের বেশি রাউন্ড গুলি ব্যবহার করে পুলিশ। শুধু ঢাকাতেই ব্যবহৃত হয় ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড গুলি।
দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান তার বক্তব্যে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বরাতে দাবি করেন-জুলাই-অগাস্টের আন্দোলন চলাকালে শেখ হাসিনা হত্যা ও লাশ গুমের নির্দেশ দেন এবং ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ অনুযায়ী তিনি এই অপরাধের দায় এড়াতে পারেন না।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আর কখনও ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রত্যাবর্তন যেন না ঘটে- এটাই এখন জনগণের প্রত্যাশা।”




