রামেক হাসপাতালে অপারেশন সিন্ডিকেট, সিরিয়াল ভেঙে ‘পছন্দের’ রোগী আগে

প্রকাশিত: মার্চ ১৪, ২০২৬; সময়: ৪:০৭ pm | 
খবর > বিশেষ সংবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে অপারেশন নিয়ে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সিরিয়াল উপেক্ষা করে ‘পছন্দের’ রোগীদের আগে অপারেশন করানো হচ্ছে। আর যাদের হাসপাতালে পরিচিত কেউ নেই বা গোপন সমঝোতা করতে পারছেন না, তাদের দিনের পর দিন ভর্তি রেখে অপারেশনের নামে হয়রানি করা হচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট সময়ে অপারেশনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও তারা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। অনেক রোগী অপারেশন থিয়েটারের সামনে মেঝেতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত জানতে পারছেন-সেদিন আর অপারেশন হবে না।

গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা রাহেলা খাতুন অভিযোগ করেন, তার ১১ বছর বয়সী মেয়ে হামিদা খাতুনকে গত ৩ মার্চ রামেক হাসপাতালের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের ২৫ নম্বর বেডে ভর্তি করানো হয়। তার মেয়ের গলায় টনসিলের গুরুতর সমস্যা, প্রতিদিন ব্যথায় কাতরাচ্ছে। কর্তব্যরত চিকিৎসক ১৪ মার্চ অপারেশনের আশ্বাস দিলেও সেদিনও অপারেশন করা হয়নি।

তিনি বলেন, “সকাল থেকে অপারেশন থিয়েটারের সামনে বসিয়ে রাখা হয়। কিন্তু সিরিয়াল অনুযায়ী ডাক্তার অপারেশন করেন না। নিজের পছন্দমতো রোগীদের ডেকে নিয়ে অপারেশন করিয়ে দিচ্ছেন।”

রাহেলা খাতুন আরও জানান, আমার মেয়ে কুরআনের ৪ পাড়া হাফেজ। রমজান মাসে তার মাদ্রাসা আছে। পড়ালেখা ছেড়ে তাকে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। এর আগেও গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তার মেয়েকে অপারেশনের জন্য ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু তখন জানানো হয় ২১ ফেব্রুয়ারির ছুটির কারণে অপারেশন সম্ভব নয়, পরে আসতে বলা হয়। এরপর আবার ভর্তি করলেও এখনও অপারেশন হয়নি।

তার অভিযোগ, তার মেয়ের পরে ভর্তি হওয়া আব্দুল্লাহ ও আলি আকবর নামে দুই শিশুর অপারেশন ইতোমধ্যে হয়ে গেছে, অথচ তাদের সিরিয়াল পরে ছিল।

গলার টনসিলের ব্যাথা নিয়ে দ্বিতীয় দফা রামেক হাসপাতালে ভর্তি হলেও এখনো অপারেশন হয়নি শিশু হামিদার।

একই অভিযোগ করেছেন অপারেশন না হওয়া শিশু সুরাইয়ার অভিভাবকরাও। দুপুর ২টার দিকে অপারেশন থিয়েটার থেকে জানানো হয়, সেদিন আর কোনো অপারেশন করা হবে না। এ কথা শুনে শিশু সুরাইয়া ও তার স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে সেখানে দায়িত্বে থাকা নার্সরা তাদের ধমক দিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেন বলে অভিযোগ করেন তারা।

রোগীদের স্বজনদের দাবি, অপারেশনের আশায় অনেকে অপারেশন থিয়েটারের সামনে মেঝেতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। কিন্তু তাদের অপারেশন আদৌ হবে কি না-সেই নিশ্চয়তাও পান না।

এ বিষয়ে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জের কক্ষে কথা বলতে গেলে কর্তব্যরত নার্সরা জানান, অপারেশন সংক্রান্ত বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। এ বিষয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

পরে শিশু হামিদা ও সুরাইয়ার অভিভাবকরা দুপুরে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকেএম মাসুদ উল ইসলামের সঙ্গে দেখা করতে যান। পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) তাদের অভিযোগ শুনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন এবং বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন।

তবে এরপরও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি রোগীর স্বজনরা। পরে ওয়ার্ডের এক কর্মচারী বিষয়টি জানার পর “দেখছি” বলে জানান। কিছুক্ষণ পরই জানিয়ে দেওয়া হয়-সেদিন আর অপারেশন হবে না।

এতে হতাশায় ভেঙে পড়েন রোগী ও তাদের স্বজনরা। সামনে ঈদুল ফিতর হওয়ায় তারা আশঙ্কা করছেন, ঈদের আগে আর অপারেশন নাও হতে পারে। এমন অভিযোগ অন্যরোগীদের থাকলেও পরে ডাক্তারদের দ্বারা হেনস্থার আশঙ্কা থেকে গণমাধ্যমে তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের অনেকেই দীর্ঘদিন হাসপাতালে থেকে খরচের চাপে পড়েছেন। এক অভিভাবক বলেন, “আমার স্বামী ভ্যান চালিয়ে সংসার চালায়। দিনের পর দিন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে, খরচ বাড়ছে-কিন্তু চিকিৎসা পাচ্ছি না।”

এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকেএম মাসুদ উল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো শোনেন এবং কয়েকজন রোগীর নাম নোট করে বলেন, “বিষয়টি আমি দেখছি। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং রোগীদের পরবর্তী করণীয় জানানো হবে।”

তবে ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনদের দাবি, হাসপাতালের অপারেশন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এসব অনিয়মের দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নিতে হবে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন