ঈদযাত্রায় উত্তরের পথে ভোগান্তির শঙ্কা

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও উত্তরের মহাসড়কজুড়ে ভোগান্তির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। চলমান নির্মাণকাজ, মহাসড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ বাজার এবং কোরবানির পশুর হাটকে ঘিরে এবারও দীর্ঘ যানজটের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইভাবে সিলেটগামী যাত্রীদেরও মহাসড়ক সম্প্রসারণকাজের কারণে দুর্ভোগে পড়তে হতে পারে।
গত রোজার ঈদেও শুরুর দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও ঈদের দুই দিন আগে উত্তরাঞ্চলগামী মহাসড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়। অনেক যাত্রীকে ঢাকা থেকে বাড়ি পৌঁছাতে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করতে হয়েছিল। এবারও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দেখা গেছে, রাজধানী থেকে বের হওয়ার পর সাভার, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে।
রাজধানীর অন্যতম বড় পশুর হাট গাবতলীতে ইতোমধ্যে গরু আসতে শুরু করেছে। উত্তরাঞ্চল থেকে আসা অধিকাংশ যানবাহন আমিনবাজার ও গাবতলী হয়ে ঢাকায় প্রবেশ ও বের হয়। পশু নামানো-ওঠানো এবং টার্মিনালকেন্দ্রিক যানবাহনের চাপের কারণে গাবতলী-আমিনবাজার সড়কে ইতোমধ্যেই যানজট দেখা দিয়েছে। ঈদযাত্রা পুরোদমে শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঢাকা ছাড়ার পর বড় ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে সাভার ও গাজীপুর এলাকায়। আশুলিয়া-বাইপাইল-ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ডিইপিজেড) এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ চলছে জোরেশোরে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ, নির্মাণসামগ্রী ও ভারী যন্ত্রপাতি পড়ে থাকায় যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে। ফলে প্রায়ই তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাইপাইল থেকে শ্রীপুর পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কজুড়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কেও। অধিকাংশ স্থানেই নির্মাণকাজ চলমান থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
এদিকে আশুলিয়ার শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে মায়ানগর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশেই পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এতে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, যানবাহনের চাপ এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে মহাসড়কে তীব্র যানজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাভার হাইওয়ে থানার পরিদর্শক শেখ শাজাহান বলেন, চলমান নির্মাণকাজ, খানাখন্দ ও সড়কে পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রীর কারণে ঈদযাত্রায় ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কার্পেটিংয়ের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। ঈদে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
গাজীপুরে যানজটের আরেক বড় কারণ হয়ে উঠেছে মহাসড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ বাজার। ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের অন্তত ১৫টি পয়েন্টে নিয়মিত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। চন্দ্রা মোড়, মাওনা চৌরাস্তা, ভবানীপুর বাজার, বাঘের বাজার, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, নয়নপুর, এমসি বাজার ও জৈনাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় বাজার বসে মহাসড়কের লেন দখল করে রাখা হয়েছে।
ইমাম পরিবহনের বাসচালক মো. মজিবুর রহমান বলেন, গাজীপুরে ঢোকার পর থেকেই বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বিশেষ করে গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, বাঘের বাজার, এমসি বাজার ও জৈনাবাজার এলাকায় অবৈধ বাজারের কারণে মহাসড়ক প্রায় অচল হয়ে পড়ে। তার ভাষায়, বৃষ্টি হলে ভোগান্তি আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের গাজীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বলেন, মহাসড়ক দখল করে থাকা অবৈধ বাজার সরিয়ে নিতে ইজারাদারদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। যারা নিজ উদ্যোগে সরাবে না, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
গাজীপুরের পর টাঙ্গাইলেও ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে। এলেঙ্গা এলাকায় ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস ও চার লেন সড়কের নির্মাণকাজ ধীরগতিতে চলায় সেখানে যানজটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নির্মাণকাজের কারণে সড়কের বড় অংশ টিনের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা হয়েছে। এতে ২৬ মিটার প্রশস্ত সড়ক সংকুচিত হয়ে গেছে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার শামসুল আলম সরকার বলেন, নির্মাণকাজ চলমান থাকায় যানজটের শঙ্কা রয়েছে। তবে সেখানে যেন যানবাহন দাঁড়িয়ে জট সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক থাকবে।
এ ছাড়া এলেঙ্গা এলাকায় টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ-জামালপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের যানবাহন মূল মহাসড়কে উঠতেই উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনকে থামতে হচ্ছে। ফলে ওই এলাকাতেও বাড়ছে যানজট।
অন্যদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধ পার্কিং ও অটোরিকশা স্ট্যান্ডও ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। চুরখাই, ত্রিশাল, ভালুকা ও স্কয়ার মাস্টারবাড়িসহ অন্তত ১০ থেকে ১২টি পয়েন্টে রাস্তার ওপর বাস ও অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ছয় লেন হলেও এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত চার লেন এবং সেতুটি মাত্র দুই লেনের। ফলে সেতু এলাকায় যানজট বাড়ছে। গত ঈদেও ছোটখাটো দুর্ঘটনা ও ওভারটেকিংয়ের কারণে দীর্ঘ সময় ভোগান্তিতে পড়েছিলেন যাত্রীরা।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। চারমাথা এলাকায় ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ চলায় সড়কের ওপর নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়েছে। ফলে পৌর শহরের ছোট একটি অংশ পার হতেই দীর্ঘ সময় লাগছে।
রংপুরগামী সেমু পরিবহনের চালক আবু হায়াত বলেন, গত রোজার ঈদে বগুড়া থেকে রংপুর যেতে আট ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছিল। এবার গরুর ট্রাক বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
দিনাজপুরগামী মাইক্রোবাসচালক ইলিয়াস বলেন, গোবিন্দগঞ্জের চারমাথায় এখনই নিয়মিত যানজট থাকে। দুই মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিতে আধা ঘণ্টা লেগে যায়। ঈদে এই ভোগান্তি কয়েকগুণ বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।




