রাজশাহীতে ছাত্রদলের কমিটিতে অছাত্র-শিবির-ছাত্রলীগ

প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬; সময়: ২:৪৫ pm | 
খবর > রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) ছাত্রলীগের সাবেক উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ছিলেন মিজানুর রহমান। হোস্টেল কক্ষে গাঁজা সেবনের সময় ধরা পড়লে তাকে কক্ষ থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই ঘটনায় ছয় মাসের জন্য তার ইন্টার্নশিপ স্থগিত করা হয়েছিল। পরে গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে আরও এক বছরের জন্য তার ইন্টার্নশিপ স্থগিত করা হয়। সেই মিজানুর রহমান এবার রামেক ছাত্রদলের সহসভাপতি পদ পেয়েছেন।

গত বুধবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ রামেক ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করে। একই দিনে রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ, রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রদলের কমিটিও ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত এসব কমিটিতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ-সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন। তারা অবিলম্বে কমিটিগুলো স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন।

রামেক ছাত্রদলের সভাপতি হয়েছেন আমরি মীম এবং সাধারণ সম্পাদক রিমন আলী। কমিটির সহসভাপতি মিজানুর রহমান নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত। সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া আবু হানিফা হানিফও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের প্রসঙ্গে একটি গ্রুপ চ্যাটে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমাদের সব পার্টি অফিস শেষ করে দিছে’।

অন্যদিকে, সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রদলের আংশিক কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে আবু সাঈদ হাসানকে এবং সদস্য সচিব করা হয়েছে শামানুল হক হৃদয়কে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবু সাঈদ হাসান বিবাহিত এবং থাই-অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার একটি সন্তানও রয়েছে। তার স্ত্রী লিপি নূর নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পারিবারিক ছবি প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে আবু সাঈদ হাসান বলেন, ‘আমি বিবাহিত, এটা ঠিক। আরও অনেকেই বিবাহিত অবস্থায় দায়িত্ব পালন করছেন। বড় ইউনিটে যদি বিবাহিতরা দায়িত্বে থাকতে পারেন, তাহলে একটি ছোট ইউনিটের দায়িত্ব পালনে এটি কোনো বাধা হওয়ার কথা নয়।’

সদস্য সচিব শামানুল হক হৃদয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকটকার হিসেবে পরিচিত। তিনি মদের বোতলের ছবি পোস্ট করে ‘খেলা চলছে’ মন্তব্য করেছিলেন। তার বিভিন্ন ভিডিওতে অশ্লীল ও আপত্তিকর বক্তব্যের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি নগরের বিনোদপুর এলাকায় তাকে কান ধরিয়ে শাস্তি দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া এক তরুণীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। ওই দিনই চন্দ্রিমা থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার ও প্রকাশ্যে অপদস্থ হওয়ার পরও তিনি নারীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিটি কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রায়হান সুইটের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। তিনি ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ২০১৯ সালের ২১ ডিসেম্বর এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বোয়ালিয়া থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়। ওই মামলায় পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্রও দাখিল করেছে।

এ ছাড়া ছিনতাইয়ের অভিযোগে ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। প্রতারণার অভিযোগে গত বছরের ১৩ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর থানায় তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়। ওই মামলায়ও তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেন। একই কলেজে যুগ্ম আহ্বায়ক পদ পাওয়া আব্দুর রহমান ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে অছাত্র হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক আগেই তার শিক্ষাজীবন শেষ হলেও তিনি কলেজ ছাত্রদলে পদ পেয়েছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে আহ্বায়ক আবু সাঈদ বলেন, ‘এগুলো তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। তবে ওমর ফারুকের ছাত্রত্ব রয়েছে। অন্য দুজনের মামলা-মোকদ্দমার বিষয়টি আমি এখন জানতে পারছি।’

এদিকে রাজশাহী নিউ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মাহমুদ হাসান লিমন। তিনিও বিবাহিত। তিনি এর আগে কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব ছিলেন। কলেজটির সিনিয়র সহসভাপতি পদ পাওয়া রাইনুদ্দিন রানা একসময় সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের মিছিলে অংশ নেওয়ার ছবিও পাওয়া গেছে।

নিউ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়া রাতুল চৌধুরী ঐক্যের বিরুদ্ধেও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিউ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইমনের শ্যালক। একই কলেজে সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পাওয়া সাব্বির মাহমুদ খানের বিরুদ্ধেও ছাত্রলীগের কর্মী থাকার অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রাজপাড়া থানায় তার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির দুটি অভিযোগ হয়েছিল।

রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে শেখ নূর মোহাম্মদ ইমনকে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, তিনি একসময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। ছাত্রলীগের এক কর্মীর জন্মদিনে কেক কাটার ছবি তিনি নিজের ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন। মহানগর ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের নতুন সভাপতি শাকিল মণ্ডলকেও শিবিরঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ফেসবুক আইডিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ছবি দেখা যায়। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান একসময় ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ছাত্রদলকে ‘ক্রস’ চিহ্ন দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে ছাত্রজীবন শেষ করার কথা জানিয়েছিলেন। রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট ছাত্রদলে পদ পাওয়া অনেককেই মহানগরের নেতারা চেনেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এসব কমিটি ঘোষণার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। শুক্রবার রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ ও সরকারি সিটি কলেজের সামনে সড়ক অবরোধ এবং টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়। সিটি কলেজে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

এ বিষয়ে মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব এমদাদুল হক লিমন বলেন, ‘কলেজ ইউনিটের এসব কমিটি কীভাবে হয়েছে, তা আমরা জানি না। কেন্দ্র আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। হঠাৎ করেই কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হয়েছেন। সে কারণেই তারা বিক্ষোভ করছেন। বিষয়টি কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে।’ সূত্র : আজকের পত্রিকা

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন