গোদাগাড়ীতে ঠিকাদারের লাইসেন্সে কাজ করছেন চেয়ারম্যান-মেম্বাররা, অনিয়মে কাজ বন্ধ
অনিয়মের অভিযোগে ড্রেন নির্মাণ বন্ধ করলেন এলাকাবাসী

আব্দুল বাতেন : রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিশেষ বরাদ্দের উন্নয়ন তহবিলের আওতায় নির্মাণাধীন একটি ড্রেনের কাজ নিম্নমানের হওয়ার অভিযোগে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শনিবার (২৭ জুন) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঝিকড়ুপাড়া গ্রামের এলাকাবাসী নির্মাণকাজে অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং প্রকল্পের তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলে কাজ বন্ধ করে দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দের এই প্রকল্পে ঠিকাদারের পরিবর্তে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও কয়েকজন সদস্য নিজেরাই কাজ পরিচালনা করছেন। এমনকি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারও দাবি করেছেন, তার লাইসেন্স ব্যবহার করে চেয়ারম্যান ও সদস্যরা কাজ করছেন।
ঝিকড়ুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সাহেরুল ইসলাম বলেন, “ড্রেন নির্মাণে প্রথম শ্রেণির ইট ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও সেখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া ড্রেনের ঢালাই কাজের পরিবর্তে নিম্নমানের খোয়া ও সিমেন্টের ঘোলা দিয়ে কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
একই গ্রামের বাসিন্দা মিনারুল ইসলাম বলেন, “কাজের মান অত্যন্ত খারাপ হওয়ায় এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। বালু, খোয়া ও সিমেন্টের অনুপাত ঠিক রাখা হচ্ছে না। কাজ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে এটি নিম্নমানের।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পের ব্যয়, কাজের পরিমাণ এবং অনুমোদিত নকশা সম্পর্কে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা সঠিক তথ্য দিতে পারেননি। প্রকল্পটি ৮ নম্বর ওয়ার্ডে হলেও ওই ওয়ার্ডের সদস্য মইদুর রহমান মুন্টুকে কাজের স্থানে দেখা যায়নি এবং তিনি কাজের বিষয়ে অবগত নন বলেও স্থানীয়রা দাবি করেন। বরং ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্যরা কাজ তদারকি করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ফারুক হোসেন ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সেলিম স্বীকার করেন যে, প্রথম শ্রেণির ইটের পরিবর্তে দ্বিতীয় শ্রেণির ইট ব্যবহার করা হচ্ছিল। তাদের দাবি, “বর্তমানে প্রথম শ্রেণির ইট পাওয়া যাচ্ছে না, তাই বিকল্প হিসেবে অন্য ইট ব্যবহার করা হয়েছে। তবে বাকি কাজ সঠিকভাবেই করা হচ্ছে।”
৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সেলিম জানান, প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ৩৭ দশমিক ৬ মিটার এবং এর বরাদ্দ ৩ লাখ টাকা। তবে কাজে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন এবং জানান, চেয়ারম্যান নিজেই কাজটি দেখভাল করছেন।
কাজের ঠিকাদার হিসেবে ফরিদুল ইসলাম সুমনের নাম উল্লেখ করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “এই কাজের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা আমার ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে নিজেরাই কাজ করছেন। বিষয়টি জানার পর আমি চেয়ারম্যানকে বলে দিয়েছি, সঠিকভাবে কাজ না করলে আমার লাইসেন্সসংক্রান্ত কাগজপত্র ফেরত দিতে।”
তবে চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে নিজেরাই কাজ করছেন—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য সেলিম ও ফারুক।
রিশিকুল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান টিটু বলেন, “প্রথমে কিছু দ্বিতীয় শ্রেণির ইট ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে সেটি বন্ধ করে ভালো মানের ইট দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।” তবে প্রকল্পটি কোন তহবিলের আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। পরে জানাবেন বললেও আর কোনো তথ্য দেননি।
এ বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের প্রকৌশলী সাদরুল ইসলাম বলেন, “এটি এলজিইডির প্রকল্প নয়। ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব বা বিশেষ বরাদ্দের কাজ হওয়ায় আমাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।”
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান বলেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কাজে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বিশ্লেষণ
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় সরকারি উন্নয়নকাজে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি ঠিকাদারি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে। অভিযোগ অনুযায়ী, একজন ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিজেরাই কাজ পরিচালনা করা হলে তা সরকারি ক্রয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার নীতিমালার পরিপন্থী হতে পারে। একইসঙ্গে প্রকল্পের তথ্য গোপন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং স্থানীয়দের কাছে জবাবদিহিতা না থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।




