সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা: ন্যায়বিচার নাকি হয়রানি?

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং চাকরি হারিয়েছেন ১৮৯ জন।

প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২৬; সময়: ২:৩৬ pm | 
খবর > আইন-আদালত

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও নাশকতার মামলাসহ নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগ বেড়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, অনুসন্ধানী সংস্থা ও মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- আন্দোলনের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করা অনেক সাংবাদিকই এখন মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে বা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

সাংবাদিক সংগঠন ও বিশিষ্টজনদের অভিযোগ, কঠোর নজরদারি, হুমকি ও সহিংসতার মধ্যেও যাঁরা ঘটনাস্থল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁদেরই একটি অংশকে এখন ‘বিচারাধীন আসামি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত কয়েকশ সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের মামলায় জড়িয়েছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানিয়েছে, এ সময়ে অন্তত ৮১৪ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৮৫ জন সরাসরি হামলার শিকার, ১৭৪ জন হত্যা মামলার আসামি, ১২ জন হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি এবং ৩৭ জন নাশকতা মামলার আসামি। একই সময়ে নিহত হয়েছেন ৬ জন সাংবাদিক।

এমএসএফের তথ্যমতে, ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি ৬২২ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হন। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানিয়েছে, গত ১৭ মাসে ৪২৭টি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮৩৪ জন সাংবাদিক। এদের মধ্যে ৩৭৯ জন আহত এবং ৩৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং চাকরি হারিয়েছেন ১৮৯ জন।

আইন বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক নেতারা বলছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই স্তম্ভকে পরিকল্পিতভাবে আঘাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হবে। এতে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের পরিবারও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারের দোসর’ নামে বাংলাদেশের আইনে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ নেই। এই ধরনের তকমা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবিষ্যতে সাংবাদিকরা তাঁদের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রতিবেদনে একাধিক ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির পরিবারের অজ্ঞাতে বা দূর সম্পর্কের সূত্র ধরে সাংবাদিকদের আসামি করা হয়েছে। কুড়িগ্রামে এক তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিককে আসামি করার অভিযোগ ওঠে। একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে লালমনিরহাট, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায়।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কিছু ক্ষেত্রে নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও জানেন না কীভাবে মামলা দায়ের হয়েছে বা কেন সাংবাদিকদের নাম যুক্ত করা হয়েছে।

সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও দি ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর মামলা হওয়া ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- হত্যা মামলাগুলো পর্যালোচনা করা হবে এবং হয়রানিমূলক মামলাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হবে।

সংবাদপত্র মালিক সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরীও একই তথ্য তুলে ধরে বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এসব মামলা পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিষয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী আগেই নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে মাঠপর্যায়ে এখনো হয়রানি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন জেলায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহু সাংবাদিক হত্যা ও নাশকতার মামলায় আসামি হয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। কেউ কেউ চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

কিছু সাংবাদিকের দাবি, ঘটনার সময় তাঁরা ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। তবুও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে তাঁদের মামলায় জড়ানো হয়েছে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের এই মামলা ও হয়রানির ঘটনাগুলো নিয়ে দেশজুড়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া, অন্যদিকে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন