ক্ষমা চাননি শেখ হাসিনা

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৭, ২০২৫; সময়: ৯:২৭ am | 
খবর > আইন-আদালত

পদ্মাটাইমস ডেস্ক: জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান দমাতে হতাহতের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ক্ষমা চাইতে রাজি নন’ বলে জানিয়েছেন। বরং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচারকে তিনি ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক প্রহসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ব্রিটিশ দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ট্রাইব্যুনাল যদি তাকে মৃত্যুদণ্ডও দেয়, তবু তিনি ‘বিস্মিত বা ভীত’ হবেন না। জুলাই-অগাস্টের আন্দোলন দমনে ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যার নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি এবং ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে প্রসিকিউশন।

সাক্ষাৎকারে নিহত আন্দোলনকারীদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হলে তিনি বলেন, “একটি জাতি হিসেবে যাদের হারিয়েছি, তাদের জন্য আমার শোক রয়েছে। এই শোকপ্রকাশ অব্যাহত থাকবে।” তবে কোনো হত্যার দায় তিনি স্বীকার করেননি। বরং দাবি করেন, ‘মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ কারণেই হতাহতের সংখ্যা বেড়েছিল।

তার দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ তিনি কখনো দেননি। আন্দোলনকে তিনি ‘সহিংস বিদ্রোহ’ উল্লেখ করে বলেন, “আমি নেতৃত্বের দায় স্বীকার করি, কিন্তু হত্যার নির্দেশ দিয়েছি- এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।”

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় সোমবার ঘোষণা করা হবে। এ মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও আসামি।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, তিনজন ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনে শেখ হাসিনা ‘নিশ্চিত করেছেন’ যে আন্দোলন দমাতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনা ড্রোন ব্যবহার করে অবস্থান শনাক্ত করা এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোরও নির্দেশ দেন। আদালতে হাসানুল হক ইনু, শেখ তাপস ও সাবেক উপাচার্যের সঙ্গে কথোপকথনের অডিও বাজানো হয়।

বিবিসির একটি অনুসন্ধানেও বলা হয়- তারা যেই অডিও যাচাই করেছে, তা থেকে বোঝা যায় শেখ হাসিনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী দমন- পীড়নের অনুমোদন দিয়েছিলেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানও বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনের তদন্ত দল তাদের প্রতিবেদনে জানায়, জুলাই আন্দোলনে একাধিক বড় হত্যাযজ্ঞ সরাসরি শেখ হাসিনার ‘নির্দেশ ও তদারকিতে’ হয়েছে। প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়- ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টে ১,৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর অস্ত্রে নিহত।

তবে নিহতের এই সংখ্যা ‘অতিরঞ্জিত’ বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে মাঠের কিছু কর্মকর্তা ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তবে নিরাপত্তা বাহিনীকে গুলি চালাতে আমি কখনো বলিনি।”

৫ আগস্ট দেশত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দেশে থাকলে আমার জীবনসহ আশপাশের মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ত।” ভারতের দ্য হিন্দু-কে অন্য এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য ভুল করেছে, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপ তার নির্দেশে হয়েছে- এ দাবি ঠিক নয়।

আদালতে যা বলেছেন হাসিনার আইনজীবী

রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমির হোসেন আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। ২১ অক্টোবর তিনি আদালতে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন-১৯৭৩ ন্যায়বিচারে “সীমাবদ্ধতা তৈরি করে”, সঠিক এভিডেন্স অ্যাক্ট প্রয়োগ করা যায় না।

তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনে ‘১,৫০০ নিহতের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে আবু সাঈদ ছাড়া অন্য কেউ নিহত হয়নি’। এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, “১৯৭১ সালেও কোনো নেতা নিহত হননি।”

আমির হোসেন বলেন, আন্দোলনকারীরা শেখ হাসিনার বক্তব্য ভুল বুঝেছেন। “হাসিনা ছাত্রদের রাজাকারের নাতিপুতি বলেননি।” জবাবে বিচারক মন্তব্য করেন, ‘রাজাকার’ শব্দটি গত ৫৪ বছর ধরে গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “১৫ বছরের শাসনে উন্নয়ন হয়েছে- পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে- এগুলো সুশাসন ছাড়া সম্ভব নয়।”

শাপলা চত্বরের ঘটনায় তিনি বলেন, “পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছিল। ৩০ জন মারা গেছে কি না, নিশ্চিত নই।” বিচারক তাকে স্মরণ করান, দ্য গার্ডিয়ানসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে।

তিনি অডিও–প্রমাণের পরীক্ষায়ও প্রশ্ন তোলেন। বলেন, “শুধু সিআইডিকে দিয়ে যাচাই করানো হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষা উচিত ছিল।” বিচারক জানান, বিবিসি ও আল জাজিরার মতো সংস্থাও অডিও যাচাই করেছে।

হেলিকপ্টার থেকে গুলির ভিডিও নিয়েও তিনি দাবি করেন- “হেলিকপ্টার দেখা গেছে, কিন্তু কে গুলি করেছে বা কেউ নিহত হয়েছে কি না- প্রমাণ নেই।”

শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে তিনি বলেন, “তিনি পালাননি, তাকে বাধ্য করা হয়েছে।”

২৩ অক্টোবর যুক্তিতর্ক শেষে তিনি আদালতকে বলেন, “আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আশা করছি মাননীয় আদালত আমার মক্কেলকে খালাস দেবেন।”

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন