মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে পদক্ষেপ না নিতে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার চিঠি

পদ্মাটাইমস ডেস্ক: মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে (আইসিটি) চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিটি পাঠিয়েছে যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক আইন সংস্থা ‘কিংসলে ন্যাপলি’।
সোমবার (৩০ মার্চ) শেখ হাসিনার পক্ষে পাঠানো এই চিঠিতে ট্রাইব্যুনালের আদেশ অবিলম্বে বাতিলের দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইন মেনে, নোটিশ দিয়ে এবং শেখ হাসিনার পছন্দের আইনজীবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করে নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার ও ট্রাইব্যুনাল এই দাবিগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়ন করবে তা ১৪ দিনের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে।
চিঠিতে বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ত্রুটি ও অসঙ্গতি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের বিচারিক বেঞ্চ এবং প্রসিকিউটর টিম রাজনৈতিক পক্ষপাত দ্বারা পুনর্গঠন করা হয়েছে। পূর্বের বিচারকদের অপসারণের কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। নতুন বেঞ্চ গঠনের প্রক্রিয়াও অন্তর্বর্তী সরকারের হঠাৎ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। প্রসিকিউটর টিমের কিছু সদস্যকে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতমূলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠে এসেছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক আইন বিশেষ করে আইসিসিপিআরের ১৪(১) অনুচ্ছেদের বিধি অনুসারে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিচারিক বেঞ্চের মধ্যে চেয়ারম্যান গোলাম মর্তুজা মজুমদার এবং বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগের অভিযোগ রয়েছে। অপর বিচারক শফিউল আলম মাহমুদের বিএনপি-সংক্রান্ত প্রকাশ্য সম্পর্কও উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়ার অবমাননা বিষয়েও চিঠিতে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। চার্জ গঠন সংক্রান্ত নোটিশ না দেওয়া, নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না দেওয়া আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার কেবল ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেখ হাসিনাকে ভারতের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা করেছে, যা প্রমাণ করে তার অনুপস্থিতি স্বেচ্ছায় হয়নি। অনুপস্থিতিতে বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘সামারি এক্সিকিউশন’ হিসেবে বিবেচিত।
চিঠির শেষ অংশে কয়েকটি দাবি করা হয়েছে। প্রথমে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় ও মৃত্যুদণ্ড বাতিল ঘোষণা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে যে কোনো বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে, যথাযথ নোটিশসহ এবং আইনজীবীর উপস্থিতিতে স্বাধীন ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন করতে হবে। তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত আইনজীবী ও অন্যান্য ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া, ট্রাইব্যুনাল এবং সরকারকে এসব ত্রুটি স্বীকার করে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে।
চিঠিতে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর টিমকেও পক্ষপাতমূলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনজীবী ছিলেন এবং তার রাজনৈতিক সংযোগের কারণে বিষয়টি পক্ষপাতমূলক হয়েছে বলে চিঠিতে বলা হয়েছে। এছাড়া দলের সমাবেশে অংশগ্রহণ এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবিও তার রাজনৈতিক পক্ষপাত প্রমাণ করে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, অপরাধীদের দায়মুক্তি এবং আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের গ্রেপ্তারসহ শারীরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু আইনজীবী এবং দলীয় নেতাদের ওপর হুমকির বিষয়ও উঠে এসেছে।
আইনি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের আইসিটি আইন মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য প্রণীত। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী প্রশাসন জুলাই মাসের বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত অপরাধের বিচারের জন্য এই আইন সংশোধন করেছে। এটি ট্রাইব্যুনালের সাংবিধানিক উদ্দেশ্যের বাইরে বেআইনি সম্প্রসারণ।
চিঠিতে চারটি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। বিচার করার কোনো আইনি এখতিয়ার আইসিটির নেই, নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগের অধিকার রোধ করা হয়েছে, এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর সঙ্গে সীমিত যোগাযোগের সুযোগ ছিল। এছাড়া, বিচারক ও প্রসিকিউটরদের রাজনৈতিক পক্ষপাত বিচার প্রক্রিয়ার ন্যায্যতাকে হ্রাস করেছে।
শেখ হাসিনার আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, আদালত ও ট্রাইব্যুনালকে এসব অভিযোগ স্বীকার করে সংশোধন করতে হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে যে কোনো বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মান অনুসারে, আইনজীবীর উপস্থিতিতে এবং যথাযথ নোটিশসহ সম্পন্ন করতে হবে।
চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করতে দেশের বাইরে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য কেউ দিতে রাজি হননি। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছেন, তারা চিঠির কথা শুনেছেন, তবে হাতে কোনো কপি নেই এবং এটি কোনো আইনি ভিত্তি বহন করে না।
চিঠি পাঠানোর পেছনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল ও সরকারকে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং আইনগত শৃঙ্খলা রক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, আদালত ও প্রসিকিউটরদের পক্ষপাতহীন, স্বাধীন এবং বৈধ বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের তদারকি প্রয়োজন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে এসব পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এমন ধরনের ত্রুটিপূর্ণ বিচার প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
শেখ হাসিনার আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট আইন সংস্থা মনে করেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়া চলা উচিত এবং অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরণ গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া, আইনগত প্রক্রিয়ার যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করা না হলে সরকারের আইনগত দায় এবং আন্তর্জাতিক তদারকির চাপ বাড়বে।
চিঠি ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, ট্রাইব্যুনাল ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতি এখন সরাসরি আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় নজরদারি বাড়ছে। আগামী ১৪ দিনের মধ্যে সরকারের প্রতিক্রিয়া চিঠিতে দাবিকৃত পদক্ষেপের বাস্তবায়ন প্রমাণ করবে।
শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠি আদালত ও ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বের সীমা, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আইনি অধিকার নিশ্চিত করার দিকে নজর দিচ্ছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থায় আইনি ন্যায্যতা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতহীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র- এশিয়া পোস্ট




